মেনু নির্বাচন করুন

ভাষা ও সংস্কৃতি

আর্থসামাজিক-রাজনৈতিক-ভৌগোলিক বহুবিধ অনুষঙ্গের কারণে অঞ্চলভেধে সংস্কৃতি ভিন্ন ভিন্ন মাত্রা রুপ পরিগ্রহ করে। তাই একটি দেশের সামগ্রিক লোকসংস্কৃতি এবং একটি বিশেষ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতিতেও অনেক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। নোয়াখালী জেলা প্রাচীন সমতট জনপদের একাংশ সোনাইমুড়ী উপজেলার দেওটি ইউনিয়ন। তাই স্বাভাবিকভাবেই এই এলাকার লোকসংস্কৃতিতে তার একটি পরিচ্ছন্ন ছাপ পরিলক্ষিত হয়। বহু ভাঙ্গা-গড়া, চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে আজকের সোনাইমুড়ী তথা দেওটি অঞ্চল যা এক সময় সম্ভাবনাময় সমৃদ্ধ জনপদ ছিল। এ অঞ্চলের লোক সংস্কৃতির প্রতি একটু ঘনিষ্ট হলে সহজেই অনুমান করা যায় যে, এ অঞ্চলের একটি সমৃদ্ধ লোক সংস্কৃতির পরিমন্ডল রয়েছে। লোক সংস্কৃতির একটি প্রধানতম শাখা লোকসাহিত্য। সোনাইমুড়ী দেওটির লোক সাহিত্য এ দেশের অন্যান্য অঞ্চলেরতুলনায় অনেকটা সমৃদ্ধ এবং জীবন ঘনিষ্ঠ; তা এ অঞ্চলের প্রবাদ-প্রবচন, আঞ্চলিক গান, ধাঁ-ধাঁ, ছড়া থেকে সহজেই অনুমেয়। নিম্নেরআলোচনায় এর স্বরুপ কিছুটা উম্মোচিত হবে।

 

নোয়াখালী-লক্ষীপুর অঞ্চলের ভাষার বৈশিষ্ট্য একই রকম, একই সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে অবস্থিত বলে এর লোক সংস্কৃতি, লোক ঐতিহ্য, লোকক্রীড়া আচার অনুষ্ঠান প্রায় একই রকম। এখানকার মানুষ প ও ফ স্থলে “হ”উচ্চারন করে। যেমন- পানি<হানি, ফুল<হুল। আমি<আঁই।

”কলা”উচ্চারণ স্থানীয় ভাবে “কেলা”বলা হয়। ক্রিয়াপদে পুরুষ ভেদে “ছত্তি”, “ছেন্নি”উচ্চারিত হয়। “এ”স্থলে অনেক ক্ষেত্রে “অ”উচ্চারিত হয়। যেমন- এখন<অন। “মহাপ্রাণ”ব্যবহার নেই বল্লেই চলে

যেমন-গ,চ,ট,ত,প,স এর ব্যবহার বেশী। অন্যদিকে ঘ,ছ,ঠ,থ,ফ,ভ,শ এর ব্যবহার খুবই সীমিত। কোন কোন ক্ষেত্রে “ঠ”এর স্থানে “ড”উচ্চারিত হয় যেমন কাঠাল<কাঁডাল।

 

কিছু আঞ্চলিক বাগধারা -প্রবাদ- প্রবচন সংকলন

১: প্রবচন > আঁআর বাইয়েরে নাদানে হাইছে, বরগ আইনতো গেছে, আঁআরে ছাইরগা মাডিতেএ দেন ।

শুদ্ধরুপ : আমার ভাইরে পেটের লোভে পাইছে, কলাপাতা আনতে গেছে (বাসনের বদলে), আমারে কয়টা মাটিতেই দেন ।
অর্থ : অনেকটা চালুনি বলে ছুঁচ তোর পোঁদে কেন ছ্যাদা , বা এক বুড়ি আরেক বুড়িরে কহে নানী এর অর্থের কাছাকাছি । খাবার নিয়া কাড়াকাড়ি করার সিচুয়েশনে ব্যবহৃত হয় ।


২ : প্রবচন > আঁআর নানুগো গাছের আম, যে হোয়ায়ায়াদ খাইছত্তি ? না, দিবো কইছে ।
শুদ্ধরুপ : আমার নানুবাড়ীর গাছের আম, অনেএএক মজা । খেয়েছিস ? না, দিবে বলছে ।
অর্থ : নাকের আগার ঝুলানো মূলার পিছনে দৌড়ানি বুঝাতে ব্যবহার করা হয় ।


৩: প্রবচন > কাউয়া মনে করে কাউয়া নিজেএ ছালাক, উরফেত্তুন আগি দিলে নিছে কি কারোগা দেখেন্নি ।
শুদ্ধরুপ : কাকে মনে করে কাক নিজেই একলা চালাক , উপর থাইকা হাইগা দিলে নিচের কেউ তো দেখবো না ।
অর্থ : বালিতে চোখ ঢাইকা কেউ দেখতাছেনা , এই ভাব ধরা বুঝাইতে ব্যবহার করা হয় । অন্যরে বোকা ভাইবা , চালাকি করতে গিয়া ধরা খাইলে , সেই অবস্থায় ব্যবহার করা হয় ।


৪: প্রবচন > মাইনষের কুডুম আইলে গেলে, গরুর কুডুম লেইলে হুঁইছলে।
শুদ্ধরুপ : মানুষের আতিথেয়তা আসা যাওয়ায়, গরুর আতিথেয়তা লেহন স্পর্শে।
অর্থ : আমানুষের কুটুম্বিতা তথা আতিথেয়তা বুঝা যায় পরস্পরের আসা যাওযার মাধ্যমে আর গরুর তা বোঝা যায় লেহনের মাধ্যমে।


৫ : প্রবাদ > হোলা গোশশা অইলে বাশশা, মাইয়া গোশশা অইলে বেইশশা
শুদ্ধরুপ : ছেলে রাগ করলে বাদশা হইতে পারে, মেয়ে রাগ করলে হয় বেশ্যা ।
অর্থ : এইটা তীব্র পুরুষতান্ত্রিক নষ্ট প্রচার । তবে সমাজরাষ্ট্রযন্ত্র এমনভাবে সেট করা আছে যে, দুঃখজনকভাবে এইটা প্রায়ই সত্যরুপে দেখা যায় ।

 

৬ : বাগধারা > কোয়াল কইচ্চা ছইরবো
শুদ্ধরুপ : কোয়েলছানা চরবে
অর্থ : উদাহরণ > আল্লাহ তোর গুষ্টি ধ্বংশ কইরবো, তোর ঘরভিডাত কোয়াল কইচ্চা ছইরবো (আল্লাহ তোর বংশ নির্বংশ করবেন, তোর ঘরের ভিটাতে কোয়েল ছানা চরবে) পরিত্যক্ত ঘরের ভিটায় বুনো কোয়েল বাসা বাঁধত সম্ভবত কোন একসময়, ধারণা করা যায় সেইখান থাইকা এই বাগধারার উদ্ভব ।


৭ : প্রবচন > হায়না আবার হোকাইয়া বাছে
শুদ্ধরুপ : পায়না, আবার পোকায়কাটা বাছে
অর্থ : ভিক্ষার চাল, কাঁড়া আর আকাঁড়া , এর কাছাকাছি অর্থ


৮ : প্রবচন> বাত নাই গরে ছালন ছালন করে
শুদ্ধরুপ : ভাত নাই ঘরে, তরকারি চায় আবার
অর্থ : মৌলিক চাহিদাই মিটে না আবার বিলাসিতার লাইগা আক্ষেপ করার অবস্থা বুঝাইতে ব্যবহার করা হয় ।


৯ : প্রবচন: আঁই আইছি আতকা/ আঁরে দরি কয় ভাত খা।
শুদ্ধরুপ: আমি হঠাৎ এলাম আর আমাকে বলছে ভাত খেতে।
অর্থ: কথা নেই বার্তা নেই হুট করে কোন প্রস্তাব দিয়ে বসা।

 

স্ত্রীর,নোয়াখালীর ভাষায় স্বামীর কাছে লেখা একটি চিঠি - See more at: http://www.bengalinews24.com/facebook-picture/2014/03/16/46393#sthash.DPZJvp1R.dpuf

 

এছাড়া ও পুঁথি পাঠছাড়াও এই অঞ্চলের মানুষ বিভিন্ন উৎসবে পালাগান, বিয়ের গান, মার্ফতি গান, গোঁসা গান, খেমটা গানের আয়োজন করে থাকে